পানিতে নেমে আলু তুলছেন কৃষকেরা, কেজিতে লোকসান ৬-৭ টাকা !

অকালবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বাজারে দরপতনের ত্রিমুখী চাপে উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা এবার চরম সংকটে পড়েছেন। মাঠে জমে থাকা পানির মধ্যে নেমে কোথাও আলু তুলতে হচ্ছে, কোথাও আবার জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে আলুখেত। এর মধ্যেই উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক নিচে নেমে আসায় কৃষকদের লোকসান আরও বেড়েছে।
সাম্প্রতিক অকালবৃষ্টি ও কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টিতে রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন আলুচাষপ্রধান জেলায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবি ও ভিডিওতেও সেই বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও কৃষকদের জমে থাকা পানির মধ্যে নেমে আলু তুলতে দেখা গেছে, আবার কোথাও জলাবদ্ধতায় আলুখেত ডুবে থাকার দৃশ্য সামনে এসেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, এই বৃষ্টি শুধু মাঠের ফসলের ক্ষতির ঝুঁকিই বাড়ায়নি, আলু তোলা, শুকানো ও সংরক্ষণের কাজও কঠিন করে তুলেছে।
কৃষকেরা বলছেন, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১৬ টাকা। কিন্তু বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১০ টাকায়। ফলে প্রতি কেজিতে গড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এ মৌসুমে আলুর উৎপাদন ভালো হলেও তা কৃষকদের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসেনি। বরং উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে এবং অনেক এলাকায় দাম উৎপাদন খরচের সমান বা তারও নিচে নেমে গেছে। এতে আগে থেকেই লোকসানে থাকা কৃষকেরা আরও চাপে পড়েছেন।

এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে অকালবৃষ্টির ধাক্কা। যেসব কৃষক এখনো পুরোপুরি আলু তুলতে পারেননি, তাঁরা দ্রুত ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। কারণ, মাঠে ভেজা অবস্থায় আলু বেশিক্ষণ পড়ে থাকলে পচন ধরে, দাগ পড়ে এবং মান নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে তোলার পর খোলা জায়গায় শুকাতে রাখা আলুও বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আলুচাষিরা এবার একসঙ্গে কয়েকটি চাপের মুখে পড়েছেন—বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, বাজারে দরপতন, হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যয়ের চাপ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার ক্ষতি। এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকের জন্য এ মৌসুমে লাভের আশা প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিয়েছেন, বৃষ্টির পর জমি থেকে দ্রুত পানি সরিয়ে ফেলতে হবে, তোলা আলু শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত আলু আলাদা করে বাছাই করতে হবে। তা না হলে সংরক্ষণের সময় পচন আরও বাড়তে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত বাজারে হস্তক্ষেপ, হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। টানা লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে আলুর আবাদ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।








